দূষিত দুপুর

দুপুরের একদম ভাল লাগছেনা । রেহানাকে দেওয়া ওয়াদা সে ভাংগেনি ।  কিন্তু আবার ভেংগেও ফেলেছে । দুপুর শান্তি পাচ্ছেনা । 

প্রায় চারকোনা ঘর তার । এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটা এলোমেলো কাপড় । বেশ মোটা ম্যাট্রেস বা দেশীয় ভাষায় বললে, একটা তোষক মাটিতে বিছানো । যা কিনা ঘরের একমাত্র জানালার গারো নীল চারকোণা গ্লাসটাকে একেবারে মাঝখানে রেখে দেয়াল কর্ণার ঘেসে মাটিতে পাতা । ফ্লোরটায় তাকালে পুরান হলদেটে মোজাইক পাথর দেখা যায়। হলদে ফ্লোরটা এই চকচক করতে থাকা অতি আধুনিক ঘরটিকে যেন একটু সহজ বা ব্যালেন্স করেছে । ক্লাসিক ব্যাপারের উপস্থিতি যেকোন কিছুতেই যেমন নিমিশেই হালকা আপন-আপন অনুভুতি দেয় !  ঠিক তেমন আরকি  ! 

ইলেক্ট্রিসিটি নেই ৷ এই দিনেও এই অঞ্চলে কারেন্ট চলে যাওয়া দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রতি বছর এই দিনে এই সময়ে ১১ মিনিটের জন্য বাংলাদেশ অঞ্চল বিদ্যুৎ ছাড়া থাকে। বিশ্বের প্রত্যেক অঞ্চল তাদের নিজেদের সুবিধামত এই বিদ্যুৎ বিহীন ১১ মিনিট কবে কখন হবে, তা বেছে নিয়েছে। সারা বছর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য অঞ্চলগুলোর জন্য যা আবশ্যক ।

দুপুরের ঘরে জানালাটা মাঝখানে রেখে যেমন বিছানা মাটিতে বিছানো । নিজেকে তেমনি বিছানার ঠিক মাঝখানে রেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে ‘দুপুর আ্হসান’ ।  তার সামনের দেয়ালটিতে লাগানো বিশাল বড় আয়নার দিকে তাকিয়ে । আয়নার একেবারে মাঝখানে দুপুরের মুখটা দেখা যাচ্ছে। প্রচন্ড হতাশ আর বিষাদগ্রস্ত চেহারার দুপুর । বাম হাতে তার সিগারেট জ্বলছে কিন্তু সে ফুঁকছে না ।  সিগারেট না টানাতে এর ধোঁয়াগুলোও স্বাধীনভাবে নিজেদের ইচ্ছামত সৃষ্টি হয়ে পরে নিজেদের ইচ্ছামতই উরছে-ভাসছে, উবেও যাচ্ছে দুপুরের এই ঘরটাতে ।  অন্য সময় হলে দুপুর ধোঁয়াদের উদ্দেশ্য করে বলত, ‘mi casa es su casa’

দপুরের ঘরে দ্বিতীয়বারের মত আসা সকল অতিথিকে দুপুর এই স্প্যানিশ বুলিটি শুনায় । কেউ প্রশ্নবিদ্ধ অবাক চাহনী দিলে দুপুর বলে দেয়, ”মানে এইটার মানে ইয়ে… নিজের বাসা মনে করে বসো… আরাম করে  ম্যান… চীল ম্যান চীল !”

দুপুর দ্বিতীয়বারেই কেন অতিথিদেরকে নিজের ঘর বা নিজের বাসাকে তাদের বাসাই মনে করতে বলে ? কারণ দুপুর অযথা কেউকে ভুংভাং বা ফেইক কথা বলে খুশী করতে চাওয়া ব্যক্তিদের মতন না, একদমই । প্রথমবার সব অতিথিরা তার এই ঘরটাতে অতিথিই ।  তাদের সাথে মেহমানের মতই আচরণ দুপুরের তরফ থেকে হয় ।  আর দুপুরের এই ঘরটাতে কেউ দ্বিতীয়বারের মত আসলে এমন কেউই আসে, যে কিনা দুপুরের কাছে সত্যিই বিশেষ ব্যক্তি । যে কোন না কোনভাবে দুপুরের মনে-মনে আপন কেউ ! আর আসলেই দুপুর তাদেরকে তার নিজের ঘরে মালিকের মত থাকতে বলে ।  কথার কথা দুপুর বলে না । 

যাইহোক ! নিজেকে বারবার এই আয়নায় দেখা আজ সকাল পর্যন্তও অন্যতম প্রিয় কাজ ছিল দুপুরের। যাকে বদ অভ্যাসও বলা যেত । নিজের পারফেক্ট জো-লাইন ওয়ালা চেহারা । প্রায় এইট প্যাকওয়ালা শরীরটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানান ভংগি করে দেখা । আরো কত কি করত দুপুর, আয়নার সামনে এলেই ! কিন্তু এই মুহুর্তে আয়ানাতে দুপুর নিজের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন, সে নিজে না প্রতিবিম্বতে অইটা ! অন্য কেউকে দেখা যাচ্ছে যেন ওখানে ! কেমন যেন অচেনা চাহনী দিচ্ছে দুপুর, নিজের দিকে নিজেই ।

ও ! ঘরটিতে সব কিছু এরকম সব কিছুর মাঝখানে কেন ?  দুপুরের ঘরটি এমনই । এত সুক্ষ্ম ভাবে প্রতিটি আসবাবপত্র এবং জিনিসপত্র রাখা, যেই ঢুকবে প্রথমে বুঝতে পারবেনা, ভাববেই শুধু । ঘটনাটা কি এখানে ? নতুন বন্ধু-বান্ধবরা বা যে কেউই প্রথমবার দুপুরের ঘরে আসে। প্রথমে অনেক্ষন ধরে তারা বলতে থাকে, “ঘরটিতে কি যেন একটা কি রহস্য আছে!” কিন্তু  তা কি ? তারা খুঁজতে চেষ্টা করে ! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুপুরই তাদের ধরিয়ে দেয় ব্যাপারটা । ঘরে আসা অতিথি অবাক হয়ে ঘরের এই জ্যামিতিক ব্যাপারটা উপভোগ করে।

রেহানাও যখন প্রথমবার দুপুরের ঘরে এসেছিল। ভ্রু দুটো কুঁচকে প্রতিটি জিনিস ধরে-ধরে ঘুরে-ঘুরে দেখছিল শুধু সে । যদিও মাত্র দুইবারই এসেছিল দুপুরের ঘরে রেহানা । প্রথমবার দুপুরকে অংক শেখাতে । পরের বার এসেছিল দুপুর রেহানার চেয়েও ভাল অংক জেনেও, কেন না জানার ভান করেছিল ? তারই কৈফিয়ত তলব করতে  !

প্রথমবার দুপুরকে ওর ঘরে এসে স্টাডি এবং দুপুরকে গনিত চর্চার জন্য একটা রুটিন করে দিয়ে যায় রেহানা । পাঁচ-পাঁচ দিন পর রেহানার মাথায় খেয়াল হয় “দুপুর হিসাবে এত কাচা হলে ঘর সুক্ষ্ম জ্যামিতির ন্যায় সাজালো কি করে !” জবাবে দুপুর রাগান্বিত রেহানাকে সত্যি কথাটিই বলে দিয়েছিল। “অনলাইনে রেহানার গণিত বিষয়ক ভ্লগ দেখে ওর সাথে যেভাবেই হোক অন্তত বন্ধুত্ব করার লোভ জন্মায় দুপুরের বুকে ! এই ই…”

সত্য স্বীকার করায় এবং আর জীবনেও দুপুর মিথ্যা বলবে না, দুপুরের কাছ থেকে এই ওয়াদা নিয়েই রেহানা দুপুরকে ক্ষমা করেছিল তখন । এইবার এবং শেষবারের মতন । এই মেয়েটি এতই সহজ-সরল আর এতই রিদয় দিয়ে সব কিছু চিন্তা করে এই যুগেও !  এইসব ভাবলেই দুপুরের বুকে কেমন যেন চঞ্চলতার  ঢেউ-ঢেউ দেওয়া আনন্দ জাগে ! এই মেয়ের জন্য তো সব কিছু করা যায় । করবেও সে। রেহানার মত মানুষের সংগ সারা জীবনের জন্য পেতে কে ই বা না চাইবে ? রেহানা ছাড়া অন্য কারো সাথে গণিত নিয়ে আলোচোনা করলে এক রকম লাগেনা দুপুরের । আগে বা পরে বহু লোকের সাথেই তো ওর গণিত বিষয়ক আড্ডা হয়েছে বা হয়। কিন্তু দুপুরের এই পুরো ইহ জীবনে কক্ষনোই এইযে এই বুকটায় এমন কেমন-কেমন মায়া-মায়া লাগা লাগেনি !

আচ্ছা আচ্ছা… দুপুরের ঘরের বিবরণে আরেকটু আসি । এতক্ষনে বিদ্যুৎ এসে পরেছে। ওর ভাত খাওয়ার সাদা প্লেটটি টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখা । উপুর করা প্লেটটির উপরে ঠিক মাঝখানে চকচক করতে থাকা তার কফি খাওয়ার সাদা মগ দেখা যাচ্ছে । ঢালাই বিছানার পর ঘরটিতে যে লিভিং স্পেইস রয়েছে তার ঠিক মধ্যখানে টেবিলটি রাখা ! উপরে ধবধবে সাদা সিলিং। তাতে ঝুলন্ত সলিড নীল সিলিং ফ্যান, ঘুরছে।  ফ্যানের সাঁই সাঁই শব্ধ তাল দেওয়ার মত শব্দ করছে , লুপ হয়ে । এই লুপ হওয়া শব্দ তাল হয়ে জ্যামিতিক ঘরটির আবহমন্ডলকে গাণিতিক হওয়ায় আরো বেশি করে বুঝি সাহায্য করছে । একবিংশ শতাব্দির ঢাকাইয়া মানুষ কেউ ঘরটিতে আসলে হয়তো বলেই ফেলতো, “হালায় ! আনাম ঘরবি হালায় হিছাব করবার লাগছে দিহি…”

হালায় জাতীয় অথবা এরকম গালি শ্রেণীর কথা-বার্তা ভাষায় ব্যবহারে *সিস্টেম এখন অনুৎসাহ করে যদিও ! তবে খাশ পুরান ঢাকাইয়া ভাষা অই অর্থে আসলে এখন কেউ ব্যবহার করেনা ।  তবে সোশাল মিডিয়ায় উঠতি তরুণ সমাজ তাদের নানান বচনে আগের দুই একটা ভাষার প্রয়োগ করছে ।  ব্যাপারটা খারাপ নাকি ভাল দুপুর তা নিয়ে হাল্কা কনফিউসড ! সে ওয়ার্ল্ড সিভিলাইজেশন কোর্সে জেনেছিল, উঠতি বয়েসী সমাজ সবসময়ই প্রচলিত ভাষাকে নিজেদের মত করে বিকৃত করে আসছে । যা কিনা এখন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ।

তবে আদিম সমাজের মুরব্বিরা সহজে তা মানতে নারাজ ছিল । এখন মুরব্বিরা তরুনদেরও আগে সিস্টেমের বৈজ্ঞানিক ব্যাখা মিশ্রিত বাণীসমূহ মেনে নেয় ।  কেননা, সিস্টেমের কথা অমাণ্য না করে, উনার দেখানো পথে চলে, কেউ যদি নিজের জীবনের গোল্ডেন জুবিলি, অর্থাৎ পঞ্চাশ বৎসরে পা দিতে পারে ।  তার জন্য সিস্টেমের তরফ থেকে রয়েছে বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে লোভনীয় অফার্ড উপহার । মার্স, মানে মংগল গ্রহের আদিবাসী হওয়ার সুযোগ । সেখানে যেকোন বয়স্ক নারী/পুরুষ এক বছর কাটালেই নাকি পৃথীবির যুবক আদিবাসীদের ন্যায় দেহে বল-বুদ্ধি এমনকি পূর্ন যুবাবস্থাও কারো-কারো ক্ষেত্রে ফিরে আসে ! এক যুগ আগেও বয়স্কদের বলা হত ‘তোমার এক পা তো কবরে!’ এখন বলা হয়, ‘তোমার এক পা তো মংগলে!’ 

বাংলাদেশের কয়েকটি আদি আঞ্চলিক ভাষা গত দুই দশক ধরে প্রিজার্ভ করা হচ্ছে । ওল্ড ঢাকাইয়া ভাষা এর মদ্ধে একটি । স্পীডি গ্লোবালাইজেশনের ফলে পুরো পৃথিবীর ভাষা ধীরে-ধীরে প্রায় কাছাকাছি রকমেরই হয়ে যাচ্ছে । আরো হবে। এখন শুধু বিশ্বের এক জায়গার ভাষা থেকে আরেক জায়গার ভাষায় শুধু উচ্চারণের তারতম্যই রয়েছে । এমনও অনেক জায়গা আছে যাদের উচ্চারণ শুনলে মনে হয় যেন আলাদা ভাষায়ই তারা কথা বলছে ! তো উচ্চারণের তারতম্যের কারণে ধীরে ধীরে নতুন ভাষার যে উৎপত্তি হবে তা কি সিস্টেম জানেনা ?  আগের ভাষাগুলোকে বিলুপ্ত করার কারণই বা কি?  দুপুর একদমই বোঝেনা ! 

লো (LOW) বা ল্যাংগুয়েজ অব অল্ড ওয়ার্ল্ড নামক সংস্থার অধীনেই মুলত এই কাজ হচ্ছে । ভাষার প্রিজার্বেশন নিয়ে বাংলাদেশ নামক এই ছোট্ট অঞ্চলের নেইটিভদেরই (আদিবাসীদের) একটু বেশি বারাবারি ছিল । এর আগে নব্বই শতকে এরা মানুষে-মানুষে মনের ভাব প্রকাশ করার আওয়াজ রক্ষার উদ্দেশ্যে নাকি লড়াইও করেছে । দুপুর বুঝতে চেয়েও বোঝেনা ! অপর পক্ষের ভাব প্রকাশ করার পন্থা, তা যেমন আওয়াজই হোক । বুঝতে পারলেই তো হল !  এর ক্ষাতিরে লড়াই করেছে আদিম মানুষ ! 

তবে পুরান ঢাকাইয়া ভাষাটা দুপুরের একটু বেশিই ভাল লাগে । আপন-আপন লাগে ।  আর প্রচন্ড পরিমাণে আপন লাগা কিছু না হারানোর তাগিদে লড়াই করাই যায় ।  দরকারে জীবন দেওয়াও যায় !  দুপুরের মন তা বুঝতে পারে ।  কিছুটা টের সে পায় । 

একটা নীল মাছি দুপুরের নাকের ডগায় বসতে চাইছে । কিছুক্ষন উরা-উরি ভন-ভন করে যেইনা বসল ।  দুপুর উঠে ভরকে ! লাফ দিয়ে সতর্ক হয় সে । জর বস্তুতে যেন হঠাৎ প্রাণ এসেছে এতক্ষনে ! বিছানায় বসে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে কিছুক্ষন কি যেন টিপাটিপি করে শেষে রাগে ল্যাপটপটি আয়নায় লক্ষ করে ছুরে মারে সে । ঝনঝন করে ভেংগে পরে আয়না ।  ভাংগা কয়েক টুকরা ঝুলে থাকে দেয়ালে। পরমুহূর্তেই বিছানা থেকে উঠে রুমের আরেক পাশের দেয়ালের মাঝখান বরাবর রাখা ওয়্যারড্রবের একেবারে নিজের ড্রয়ার খুলে সে । কিছু কাগজ-পত্র বের হয়ে আসে । অনেকগুলো কাগজের তন্ন-তন্ন হওয়ার পর নিজের কিছু একাডেমিক সনদ আর জন্ম নিবন্ধনের কাগজ হাতে আসে দুপুরের । কাগজ গুলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকে দুপুর । ছিরে ফেলে টুকরো-টুকরো করে সবগুলো কাগজ দুপুর এক-এক করে । এইদিকে টুকরো-টুকরো কাগজ ।  আর অইদিকে টুকর-টুকরো ধারালো কাচ ।

দুপুর এখনো শকড! সাতাইশটা বছর নিজের এই শরীরের সাথে এই শরীরটা নিয়ে বসবাস করে নিজেই নিজেকে সে চিনতে পারলোনা !  একটা সামান্য ধাতুর কাছে তার নিজেকে চিনতে হল ! জানতে হল!  আবার এমন করে, এমনই মুহুর্তে ! 

আসলে দুপুরের হয়েছিল কি ? পেছনের কারণ ভয়াবহ !  আবার তেমন কিছুই না এই কারণ ! যে যেইভাবে নেয় আরকি ।  মানুষ যেইভাবে নিক, তা পরের ব্যাপার ! দুপুর নিজেই নিজেকে মেনে নিতে পারছেনা ।  ঘটনা হল…

দীর্ঘ তিন মাসের প্লান করে আজ সকালে যমুনা ফিউচার পার্কের মত ভরা মজলিশে তার ভালবাসা নিজের জীবনের সব চাইতে প্রিয় এবং আপন একটা মানুষ রেহানাকে অবশেষে সাহস করে প্রপোজ করেই ফেলে দুপুর । 

সাধারণতই রেহানা প্রথমে ভরকে যেয়ে, পরে অবাক হয়ে শেষে মুগ্ধতা নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। এইরকম সীন এইরকম জায়গায় ঘটলে যা হয় । তাই হল । তাদের ঘীরে গোল হয়ে উঠে মানুষের ভীর । জমে উঠা দর্শকের ঢল এই দুপুর বেলায় দুপুরকে আরো চাংগা করে তোলে ।  এরপর রেহানার খুশীতে ফেটে পরা কাঁদো কাঁদো চেহারা চাংগা হওয়া দুপুরকে খুব নায়ক-নায়ক একটা ফীল দিতে থাকে । মুহুর্তেই দুপুর এক হাটু গেরে সিনেমায় দেখা নায়কের মত করেই বসে পরে রেহানার দরবারে । ঠিক নায়কদের মতই রেহানাকে চিৎকার করে দুপুর আবার বলে, Will You Marry Me, Rehaana ?

রেহানা কিছু একটা বলে জবাবে ! শুনতে পায়না দুপুর । মিস হয়ে গেল ! নিশ্চয়ই Yes বলেছিল ।  কারণ পরপরই চারদিকের মানুষের উল্লাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে পরে চারদিক । অনেকেই মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছিল এই দৃশ্য ।  পরে রেহানার মুখের Yes বলাটি কারো না কারো ভিডিওতেই দেখে নিবে দুপুর । হাস্যজ্বল রেহানাকে সবুজ পাথর বসানো আংটিটি আংগুলে পরিয়ে দিতে দিতে ভাবে দুপুর ৷ রেহানার দুই চোঁখে ছলছল করছে পানি । 

এখন দুপুরের পরবর্তি কাজ হবে নায়কের মত দাঁড়িয়ে রেহানার ছলছল আঁখি দুটো মুছে দিয়ে বীরের ন্যায় প্রেয়সীকে বুকে জড়িয়ে ধরা ! ওদের দুজনের মত আশেপাশে জমে উঠা পাবলিকও ভীষণ উত্তেজিত ! তারাও যেন রেহানা-দুপুরের খুশীতে সমান খুশী !  

কিন্তু একি !  দুপুরের হাটু নড়ছেনা কেন ? আয়হায় ! হাটু যে দেখি মাটির সাথে জোড়া লেগে গেছে যেন ! আশেপাশের জমে উঠা জনগণ ফুটো বেলুনের মত চুপসে যেতে থাকে । এখন দর্শকরা যা করছে সেটা হচ্ছে একে-অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ী আর সাথে গুনগুন । এর ভেতর থেকে একজন লাল ক্যাপ পরা লোক মোবাইল দিয়ে ভিডিও করতে করতে দুপুর আর এখনো থমকে ‘থ’ হয়ে থাকা রেহানার দিকে এগিয়ে আসে ।

ভিডিও করতে করতেই লাল ক্যাপওয়ালা কথা চালিয়ে যায় তার নিজের ভ্লগের দর্শকের উদ্দেশ্যে, “দর্শক মন্ডলি ঘটনায় নতুন টুইস্ট ! এই মাত্র প্রমাণ সহ যা বুঝতে পারলাম, আমাদের এই প্রেমিক আসলে is not a real প্রেমিক ! এটি আসলে একটি ফার্স্ট ক্লাস রোবট ।  দেখুন !  দেখুন এই যে, রোবটটির মেটালিক হাটু যমুনা ফিউচার পার্কের ফ্লোরে লাগানো ই-চুম্বক কিভাবে আটকিয়ে রেখেছে ! ইদানিং ছোট-ছোট রোবট গাড়িগুলোর হাত থেকে কাস্টমারদের মানিব্যাগ এবং মূল্যবান সামগ্রির চুরি হওয়া রোধ করতে বসানো ইলেক্ট্রিক ম্যাগনেটিক ফ্লোর ! আজ দেখুন এই ফ্লোর কোন চোর ধরেছে ! কি ভয়ানক ! দেখুন ভিউয়ার্স ! বৈজ্ঞানিক এই ভয়ানক আগ্রাসনের ভয়াবহ রূপ দেখুন !  এতদিন টাকা-পয়সা মেটালস নানান মূল্যবান সামগ্রি এই রোবটদের হাত থেকে বাঁচানোর কথা ভাবতাম আমরা ।  আজ থেকে দর্শক আপনি আপনার ঘরের মা-বোনদের এদের হাত থেকে বাচানোর দুঃচিন্তা শুরু করুন  ! ভাইয়েরা, এইযে দেখুন এই অসহায় বোনটিকে ।  কি নাজেহাল অবস্থা হয়েছে বোনটির। গাইজ! ফার্স্ট ক্লাস তুচ্ছ যন্ত্র, সামান্য একটি রোবটের জন্য…”

লাল ক্যাপ ভ্লগার রেহানার দিকে তার ক্যামেরা নিতেই রেহানার এতক্ষন যাবত থমকে থাকাতে হুশ আসে । হাত দিয়ে রেহানার সরিয়ে দেওয়ায় লাল ক্যাপ ভ্লগারের ভিডিও করা কোনভাবে চাপ লেগে বন্ধ হয়ে যায় । এই পর্যন্তই ধারণ হওয়া লাইভ ভিডিওটি এরই মদ্ধে সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় । যেখানে বেশিরভাগ কমেন্ট এরূপঃ ”রোবট হয়ে ভালবাসার ফিলিংস পেলো সে কি করে !  কোথা থেকে ?” … “সিস্টেম কবে থেকে রোবটে ইমোশোন দিতে সফল হল… ?” “কিভাবে তাদের অঞ্চলে-অঞ্চলে উন্মুক্ত করে দিল সম্মানীত সিস্টেম ?” একজনের কমেন্ট তো এমনও ছিল যে, “গত সপ্তায় তার ফুফু তবে প্রতিবেশি রোবটটির সাথেই ভেগে গিয়েছিল ” ব্লা ব্লা ব্লা…

দুপুরের প্রপোজের ঘটনায় আসি।
অইযে তখন !  হাত দিয়ে সেই লাল ক্যাপ ভ্লগারকে সরিয়ে দেওয়ার পর রেহানা নিজেও দুই হাটু গেরে বসে পরেছিল দুপুরের সামনে । একদম চুপ হয়ে যাওয়া অবাক চেহারার দুপুরের মাথাটা নিজের বুকে জড়িয়ে, লুকিয়ে ফেলে তখন রেহানা । হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে যমুনা ফিউচার পার্ক মার্কেটের কতৃপক্ষকে ম্যাগনেটিক ফ্লোরের সুইচ এক সেকেন্ড এর জন্য অফ করার অনুরোধ করতে থাকা, রেহানার-দুপুরের সেই মুহুর্তের ভিডিও করেনি কেউ । করলেও বাজারে, মানে কোন মিডিয়ায় ছাড়েনি। ছাড়লে যুবক রোবটটির একমাত্র আপনজনের বুকে আশ্রয় পেয়ে । প্রেমিকার ওড়নায় লুকিয়ে। আশেপাশের মানুষদের দিকে ভয়ার্ত শিশুর ন্যায় অল্প-অল্প করে তাকাতে থাকা, গোলগোল চোঁখ দুটিও তারা দেখতে পেতো !

হয়তো দেখতো না !  তবে ভাইরাল হলে, অবশ্যই দেখতো । তখন একটু সুন্দর করেই *দূষিত হত আজকের দুপুর !!

শেষ

* সিস্টেমঃ সরকার বিহিন কম্পিউটারাইজড বিশ্ব নীতি-নিয়ন্ত্রক ।

* দূষিত দুপুরঃ ভাইরাল দুপুর । 

শুধু আমার’ই দোষ ! তাই না ?

“তপু ! তপু তুই কই ? এই তপু ?”

তপুর মা তবুও তপুর জবাব পায়না । বাড়ান্দা, টয়লেট কোথাও খুঁজে না পেয়ে তিনি স্বামীকে যেয়ে ধমকাতে থাকেন । তপুর বাবা টেলিভিশনে খবর দেখছিলেন । এর মদ্ধে, “তপু কোথায় গেল ? ছাদে কি গেল নাকি ? আমি রান্নায় ব্যস্ত এর মদ্ধে তোমার ছেলে কোথায় গেল খেয়াল রাখবানা ? খবর দেখে দেখে কি পৃথিবী পরিবর্তন করে ফেলবা ? নাকি নিজের পৃথিবী নিজের ঘর’টা ঠিক রাখবা ?”

“আহা ! ছাদে যায়া ঘুড়ি উড়াইতাছে হয়তো । দাঁড়াও এক্ষনি কান ধইরা নিয়া আসতাছি” বলে বাবা টিভি অফ করে উঠে যান । “ছেলের কান না শুধু, নিজে কান ধরে ছাদে যান আপনিও, একটা ছেলে এইটারে দেইখা রাখতে পারেনা, আবার আরেকটা…” বউকে পরের কথা বলার আর সুযোগ না দিয়েই তপুর বাবা নিজের কান ধরে স্ত্রী’র দিকে মুখ করে তাকিয়ে তাকিয়েই, পেছনের দিকে রোবটের মত হাটঁতে থাকেন, কমেডির মত ভংগি করে ।

ছাঁদ থেকে তপুর বাবার কল আসে তপুর মা’র নাম্বারে । “ছাঁদ তো পুরা ফাকা, কেউ তো নাই !” আতঙ্কিত আর আন-ইজি গলার স্বর শুনা যায় । মা’য়ের মুখ রাগে লাল হতে থাকে । কিছু বলতে নেয় । এর মদ্ধেই রান্না ঘরের পাশে ঝুলানো ফ্ল্যাটের কমন লেন-ফোনের ক্রিং ক্রিং শুনা যায়। “তোমার ছেলে যদি আবারো বাইরে যায়না…!” এইখানে এই কথা শেষ না করেই তিনি ক্রিং ক্রিং শব্দ লেন-ফোন কানে লাগিয়ে থামান ।

একটু পরে । তপুর কান ধরে বাবা ওকে নিয়ে বাসায়, মানে ওদের ফ্ল্যাটে ঢুকেন । মা যেয়ে তপুর গাল বরাবর যেই না থাপ্পর’টা দিতে নেয় তখন’ই বাবা বলেন, “আরে আরে নো নো, নো ভায়োলেন্স ! পৃথীবি দেখোনা এখন ভায়োলেন্স অশান্তি বন্ধ করতে বলতেছে ? তপু পাবে এখন ভায়োলেন্স বিহিন শাস্তি ! দেখো ওর আজকে খবরই আছে, কত্ত বড় সাহস! বেট্টা…!” তপুর মুখ খানিক দুঃখ খানিক’টা অভিমাণ আর খানিক রাগ মিশ্রিতও দেখা যাচ্ছে ।

তপু ওর ঘরে বন্দি । বাইরে থেকে লক করা দরজা । “নো বাইরে বের হওয়া হওয়ি, নিচে দাড়োয়ানদের গেইট পর্যন্ত গেছোনা ? কে জানে করোনা নিয়া আসছো কিনা ! আইসোলেশন শাস্তি পালন কর এবার ।”

এখন নিয়ম হচ্ছে তপুর বন্দি ঘরে সময় মত খাবার চলে যায় । ওর প্রিয় প্রিয় খাবার। যেমন, আইস্ক্রিম মালটোভা ইত্যাদি অন্য সময়ের লিমিটেশনের চেয়ে বেশি ওর ঘরে নির্দিষ্ট সময়ে সময়ে দেওয়া হয় । কিন্তু প্রত্যেক বারই আগের বারের খাবার একটুও না খেয়ে তপু ফেরত দেয় ।

“আমার ঈদ কার্ডের দোকান দেওয়ার জন্য আমাকে বাইরে যেতে না দিলে আমি কিছু খাচ্ছিনা । ঈদ কার্ড আর দোকান ব্যবসা বাসার নিচের গলিতে এইবার দিতে না পারলে ঈদ হবে নাকি ?

বাবার কথা, “পরের বার অনেক বড় করে দোকান দেওয়া হবে!”

মায়ের কথা, “থাব্রায়া তপুর সব দাঁত ফেলায়া দিয়ে, ঈদের গিফট হিসেবে সব আত্বীয়-স্বজনদের একটা একটা দাঁত পাঠানো হবে, আরেকবার দোকান দোকান করলেই ।”

তপুর কথা, ” ও আমি করলেই দোষ? টিভিতে দেখাচ্ছে সব দোকান-টোকান, মার্কেটে যেয়ে যেয়ে বাজার করছে সবাই । তাদের কোন দোষ কেন নাই ?”

তপুর তার ঘরে বন্দি জীবনে কম্পিউটারে গেইম খেলতে আগ্রহ বোধ করছেনা । কিচ্ছু ভাল্লাগছেনা । একেক বার একেক বন্ধু দের সাথে ফোনে কথা বলেও লাভ হচ্ছে না তার । “এই সময়ে ঈদ কার্ড কিনে আনা । তার দোকান দেওয়া । সবাইকে কার্ড না পাঠাইলে কেমনে কি, কিসের ঈদ তা’ই সে ভাবে ।”

কি যেন তার মাথার মদ্ধে উদয় হয় । কম্পিউটারে যেয়ে বসে সে ।

তপুর কম্পিউটারের পাশে রাখা প্রিন্টার থেকে প্রিন্ট হয়ে অনেক অনেক ডিজাইন করা কার্টুন আঁকা কাগজ বের হতে থাকে । কাগজে অনেক জায়গায় ‘ঈদ মুবারাকও লেখা ।

তপু দুইটা ভাজ করা ডিজাইন করা কাগজ যা ঈদ কার্ডের মত দেখতে হাতে করে নিয়ে এসে একটা বাবাকে আর একটা মা’কে দিয়ে বলে, “ঈদ মুবারক আব্বু, ঈদ মুবারাক আম্মু”

বাবা মা দুইজনই অবাক, এই কান্ডে । মা কিচ্ছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পরক্ষনেই হাসি দিয়ে বলে, “তো আরো কি ঈদ কার্ডের ডেলিভারি দেওয়া যাবে ? একটা আমার একমাত্র ছেলে আর একটা আমার একমাত্র স্বামীকে ঈদ উপলক্ষে, দিব । বাবা খুশির চোটে বলতে থাকেন, সাব্বাশ বেট্টা, সাব্বাশ ! সাব্বাশ… !

কিন্তু তপুর মুখ অভিমানে আর খানিক রাগেও ভরা । এই ভরা মনে সে তার ঘরে যায় । বিছানায় আধ শোয়া হয়ে থাকে ।

একটু পরে তপুর মা’র গলা । “তপু! তপু ! তোমার ফোন আসছে লেন-ফোনে ।”

তপু অবাক হয়ে যেয়ে ল্যান ফোন কানে লাগায় । পেছনে বাবা মা দাড়িয়ে আছে । তপু কি যেন কি কথা বলে ফোন রাখে ! রাখার একটু খানিক পর পর আরো কয়েকটা ফোন আসে । তপু আগের মতই কিছুক্ষন “হু হা, কোন ব্যাপার’ই না । পৌঁছে যাবে ।” এইসব কথা-বার্তা বলে বলে খুব ভাব নিয়ে ল্যান ফোন রাখে ।

তপুর বাবা তপুর দিকে অবাক হয়ে তাকায় ? চেহারায় আর হাত দিয়ে এমন ভংগি করে ছেলের দিকে তাকিয়ে । যার মানে , “কি ব্যাপার ঘটনা কি ?”

“তিন তলার আশা, চার এর রাকিব-রাতুল, দুই তলার আন্টি, আর সায়মাও তাদের বাসার সবার জন্য ঈদ কার্ডের অর্ডার দিল” বলে তপু খুব প্রফেশনাল ব্যবসায়ী হয়ে গেছে এখন সে , এমন ভংগি করে, ভাব বজায় রেখে, নিজের ঘরে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে ।

ঘরের ওইপাশ থেকে তপুর গলা শুনা যায়, “কেউ যেন আমাকে ডিস্টার্ব না করে! ঈদ কার্ড ডিজাইন করা অনেক কষ্ট আছে ! আর আমার প্রিয় খাবার যেন ঠিক সময় মত আমার ঘরে হাজির থাকে! “

( শেষ )

আয়নার আয় ! না ?

আয়না ! এই আয়না এক কাপ চা দিয়ে যা। কিরে কোথায় গেলি?

বেডরুমে বেড এ শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে কাজের মেয়েকে ডাকছেন মিসেস জাহেদ। আজকে অফিস থেকে ফিরতে তার স্বামি ভিকি জাহেদ এর অন্যান্য দিন থেকে একটু বেশিই দেরি হচ্ছে। ফোন করে ভিকি তাকে বলে দিয়েছে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। তবুও স্বামির ফেরার জন্যে অপেক্ষা করছে সে।

অনেক্ষন ডাকাডাকি করার পরও আয়নার কোন জবাব নেই দেখে মিসেস জাহেদ নিজেই উঠলেন আয়নার শোয়ার ঘর রান্না ঘরের উদ্দেশ্যে।

বেডরুম থেকে বের হয়ে মিসেস জাহেদ ড্রয়িংরুমের বাতি জালালেন। শুন্য নিরব ঘর।
করিডরের বাতি, ড্রয়িং রুমের বাতি তিনি জালিয়েই রেখে ছিলেন। এখন সব নেভানো কেন তিনি বুঝতে পারছেন না। প্রথমে ডর‍্যিং রুমের এবং পরে করিডরের বাতি আস্তে আস্তে জালাতে জালাতে তিনি ধীরে ধীরে রান্না ঘরের দিকে এগুতে থাকলেন তিনি। রান্না ঘরের দিকে এসে দেখলেন এখানেও বাতি নেভানো। দুইবার আয়না ! আয়না !  করে ডাক দিয়েও কোন জবাব না পেয়ে বাতি জালালেন তিনি।

মিসেস জাহেদ হা করে তাকিয়ে রইলেন। আয়না রান্না ঘরের কোনায় কুজো হয়ে বসে হাতে একটি আয়না ধরে আছে। বাতি জালানোর সাথে সাথে তার দিকে তাকিয়ে আয়না বলে, মিশটি শেষ!

আয়নাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কাঁদছিল। অপ্রস্তুত মিসেস জাহেদ এর ভ্রম আয়নার কথায় ভাংগে।

– মিশটি শেষ মানে? চিনি শেষ? যা নিচের দোকান থেকে এক কেজি চিনি আয়!
– আচ্ছা। বলে আয়না তার হাতে ধরা আয়না নিয়েই যেতে নেয় নিচে।
– এটা নিয়ে যাচ্ছিস কেন? রেখে যা !
– জী আপা ।

আয়না দোকানে যাওয়ার পর মিসেস জাহেদ আয়নার আয়না ধরে দেখতে থাকেন অবাক হয়ে। অন্য সব আয়নার মতই দেখতে এই আয়না। শুধু মাজখানে লম্বা এক ফাটলের দাগ। কিন্তু আয়নায় তার চেহারা মোটেও বোঝা যাচ্ছে না। পুরো ঘোলা। হঠাত ফাটা যায়গাটার কোনায় চকচক করে উঠে। ফাটা জায়গায় আংগুল দিয়েই আও করে উঠলেন তিনি। আংগুল দিয়ে রক্ত ঝরছে তার। ফাটা যায়গায় তার আংগুল থেকে পরা রক্ত খানিকটা লেগে আছে এখনো। রাগে রান্না ঘরের জানালা দিয়ে আয়নাটা ছুড়ে মারলেন তিনি।

মিসেস জাহেদ তার কাটা আংগুলে বেন্ড এইড লাগাচ্ছেন। আয়না চিনির প্যাকেট হাতে তার সামনে আসে। আয়না কে দেখে মিসেস জাহেদ বলতে নেন, শোন তোর ভাংগা আয়না….

বলতে বলতেই আয়না তার আরেক হাতে থাকা সেই আয়না মিসেস জাহেদের দিকে ধরে, আর শিতল ভাবে বলে, নিচে পরে গেছিল মনে হয়। নিয়া আসছি।

হা করে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকেন মিসেস জাহেদ। আয়না চিনির প্যাকেট আর তার হাতে থাকা আয়না নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়।

মিসেস জাহেদ বেড এ আধো শোয়া হয়ে চা খাচ্ছেন আর টিভি দেখছেন।

– আয়না ! আয়না ! ডয়িং রুমের বাতিটা নিভালি কেন ! জালিয়ে দে! এই আয়না !

মিসেস জাহেদ বিরক্ত হয়ে উঠে বসেন। ড্রয়িং
রুম পার করে তিনি রান্না ঘরের দিকে যান। রান্না ঘরের কাছাকাছি এসে সে ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ পান। মনে হচ্ছে আয়নাই কার সাথে যেন কথা বলছে, না না! তুমি আমাকে নাও। যত রক্ত লাগে নাও।
– কিরে আয়না ! কার সাথে কথা বলছিস? বলে মিসেস জাহেদ রান্না ঘরের বাতি জালিয়ে যা দেখলেন তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
আয়নার হাত থেকে ঝরঝর করে রক্ত পরছে। আর আয়না কাঁদছে। 

আয়না ঠিক আগের মত বাতি জালানোর সাথে সাথে মিসেস জাহেদের দিকে তাকিয়ে বলে, ও আরো রক্ত চায়। কিন্তু আমার না !

মিসেস জাহেদের ভ্রম ঠিক আগের মতই আয়নার কথায় ভাংগে।

– এই জন্যেই এই অলুক্ষনে আয়না ফেলে দিয়েছিলাম আমি। দে দে এক্ষুনি দে এটা আমার কাছে ।

বলে আয়নার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আবার জানালা দিয়ে ফেলে দেয় ঠিক আগের মতই। পেছন থেকে আয়না না না বলে চিৎকার করতে থাকে।

রাগান্নিত ভাবে হাটতে হাটতে মিসেস জাহেদ তার বেডরুমে যান। যেয়ে টিভি ছেড়ে আবার আগের মত শুয়ে দেখতে থাকেন।

টিভি তে নিউজ হচ্ছে। এই মাত্র খবর পাওয়া গেছে শাহবাগে হঠাত বোমা বিস্ফোরনে গুরুতর আহত তিন এবং নিহত পাচ।

মিসেস জাহেদের স্বামি ভিকি জাহদের অফিস শাহবাগেই। সে তারাতারি মোবাইল হাতে নিয়ে স্বামির নাম্বারে ফোন করতে থাকেন। ফোন যাচ্ছেনা। বার বার ব্যাস্ত বলছে।

বৃশটি শুরু হয়েছে আবার। হঠাত ভীষণ জোরে বিদ্যুত চমকে উঠে। সাথে সাথে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ঠিক আয়নার আয়নার মত মাজখানে ফেটে যায়। মিসেস জাহেদ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ফাটা জায়গা থেকে ঝরঝর করে রক্ত ঝরতে থাকে। আবার জোরে বিদ্যুত চমকায়। আর সাথে সাথেই বাতি নিভে যায়। মিসেস জাহেদের মৃত্যু ভয়ের ভয়ার্ত চিৎকারে পুরো বাড়ি কেপে উঠে।

মোসাদ্দেক চা দোকানদার পান চিবুতে চিবুতে চা বানাচ্ছে। চা’য়ের কাপ দুটো সে কাস্টমারদের দিয়ে দাত খিলি দিয়ে পান খাওয়া দাত খোচাতে খোচাতে সেই আয়নার আয়না বের করে মুখের সামনে ধরে দাত খোচায় আর গান গায়, আয়নাতে তুমি অই মুখ দেখবা যখন…

(শেষ)