শুধু আমার’ই দোষ ! তাই না ?

“তপু ! তপু তুই কই ? এই তপু ?”

তপুর মা তবুও তপুর জবাব পায়না । বাড়ান্দা, টয়লেট কোথাও খুঁজে না পেয়ে তিনি স্বামীকে যেয়ে ধমকাতে থাকেন । তপুর বাবা টেলিভিশনে খবর দেখছিলেন । এর মদ্ধে, “তপু কোথায় গেল ? ছাদে কি গেল নাকি ? আমি রান্নায় ব্যস্ত এর মদ্ধে তোমার ছেলে কোথায় গেল খেয়াল রাখবানা ? খবর দেখে দেখে কি পৃথিবী পরিবর্তন করে ফেলবা ? নাকি নিজের পৃথিবী নিজের ঘর’টা ঠিক রাখবা ?”

“আহা ! ছাদে যায়া ঘুড়ি উড়াইতাছে হয়তো । দাঁড়াও এক্ষনি কান ধইরা নিয়া আসতাছি” বলে বাবা টিভি অফ করে উঠে যান । “ছেলের কান না শুধু, নিজে কান ধরে ছাদে যান আপনিও, একটা ছেলে এইটারে দেইখা রাখতে পারেনা, আবার আরেকটা…” বউকে পরের কথা বলার আর সুযোগ না দিয়েই তপুর বাবা নিজের কান ধরে স্ত্রী’র দিকে মুখ করে তাকিয়ে তাকিয়েই, পেছনের দিকে রোবটের মত হাটঁতে থাকেন, কমেডির মত ভংগি করে ।

ছাঁদ থেকে তপুর বাবার কল আসে তপুর মা’র নাম্বারে । “ছাঁদ তো পুরা ফাকা, কেউ তো নাই !” আতঙ্কিত আর আন-ইজি গলার স্বর শুনা যায় । মা’য়ের মুখ রাগে লাল হতে থাকে । কিছু বলতে নেয় । এর মদ্ধেই রান্না ঘরের পাশে ঝুলানো ফ্ল্যাটের কমন লেন-ফোনের ক্রিং ক্রিং শুনা যায়। “তোমার ছেলে যদি আবারো বাইরে যায়না…!” এইখানে এই কথা শেষ না করেই তিনি ক্রিং ক্রিং শব্দ লেন-ফোন কানে লাগিয়ে থামান ।

একটু পরে । তপুর কান ধরে বাবা ওকে নিয়ে বাসায়, মানে ওদের ফ্ল্যাটে ঢুকেন । মা যেয়ে তপুর গাল বরাবর যেই না থাপ্পর’টা দিতে নেয় তখন’ই বাবা বলেন, “আরে আরে নো নো, নো ভায়োলেন্স ! পৃথীবি দেখোনা এখন ভায়োলেন্স অশান্তি বন্ধ করতে বলতেছে ? তপু পাবে এখন ভায়োলেন্স বিহিন শাস্তি ! দেখো ওর আজকে খবরই আছে, কত্ত বড় সাহস! বেট্টা…!” তপুর মুখ খানিক দুঃখ খানিক’টা অভিমাণ আর খানিক রাগ মিশ্রিতও দেখা যাচ্ছে ।

তপু ওর ঘরে বন্দি । বাইরে থেকে লক করা দরজা । “নো বাইরে বের হওয়া হওয়ি, নিচে দাড়োয়ানদের গেইট পর্যন্ত গেছোনা ? কে জানে করোনা নিয়া আসছো কিনা ! আইসোলেশন শাস্তি পালন কর এবার ।”

এখন নিয়ম হচ্ছে তপুর বন্দি ঘরে সময় মত খাবার চলে যায় । ওর প্রিয় প্রিয় খাবার। যেমন, আইস্ক্রিম মালটোভা ইত্যাদি অন্য সময়ের লিমিটেশনের চেয়ে বেশি ওর ঘরে নির্দিষ্ট সময়ে সময়ে দেওয়া হয় । কিন্তু প্রত্যেক বারই আগের বারের খাবার একটুও না খেয়ে তপু ফেরত দেয় ।

“আমার ঈদ কার্ডের দোকান দেওয়ার জন্য আমাকে বাইরে যেতে না দিলে আমি কিছু খাচ্ছিনা । ঈদ কার্ড আর দোকান ব্যবসা বাসার নিচের গলিতে এইবার দিতে না পারলে ঈদ হবে নাকি ?

বাবার কথা, “পরের বার অনেক বড় করে দোকান দেওয়া হবে!”

মায়ের কথা, “থাব্রায়া তপুর সব দাঁত ফেলায়া দিয়ে, ঈদের গিফট হিসেবে সব আত্বীয়-স্বজনদের একটা একটা দাঁত পাঠানো হবে, আরেকবার দোকান দোকান করলেই ।”

তপুর কথা, ” ও আমি করলেই দোষ? টিভিতে দেখাচ্ছে সব দোকান-টোকান, মার্কেটে যেয়ে যেয়ে বাজার করছে সবাই । তাদের কোন দোষ কেন নাই ?”

তপুর তার ঘরে বন্দি জীবনে কম্পিউটারে গেইম খেলতে আগ্রহ বোধ করছেনা । কিচ্ছু ভাল্লাগছেনা । একেক বার একেক বন্ধু দের সাথে ফোনে কথা বলেও লাভ হচ্ছে না তার । “এই সময়ে ঈদ কার্ড কিনে আনা । তার দোকান দেওয়া । সবাইকে কার্ড না পাঠাইলে কেমনে কি, কিসের ঈদ তা’ই সে ভাবে ।”

কি যেন তার মাথার মদ্ধে উদয় হয় । কম্পিউটারে যেয়ে বসে সে ।

তপুর কম্পিউটারের পাশে রাখা প্রিন্টার থেকে প্রিন্ট হয়ে অনেক অনেক ডিজাইন করা কার্টুন আঁকা কাগজ বের হতে থাকে । কাগজে অনেক জায়গায় ‘ঈদ মুবারাকও লেখা ।

তপু দুইটা ভাজ করা ডিজাইন করা কাগজ যা ঈদ কার্ডের মত দেখতে হাতে করে নিয়ে এসে একটা বাবাকে আর একটা মা’কে দিয়ে বলে, “ঈদ মুবারক আব্বু, ঈদ মুবারাক আম্মু”

বাবা মা দুইজনই অবাক, এই কান্ডে । মা কিচ্ছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পরক্ষনেই হাসি দিয়ে বলে, “তো আরো কি ঈদ কার্ডের ডেলিভারি দেওয়া যাবে ? একটা আমার একমাত্র ছেলে আর একটা আমার একমাত্র স্বামীকে ঈদ উপলক্ষে, দিব । বাবা খুশির চোটে বলতে থাকেন, সাব্বাশ বেট্টা, সাব্বাশ ! সাব্বাশ… !

কিন্তু তপুর মুখ অভিমানে আর খানিক রাগেও ভরা । এই ভরা মনে সে তার ঘরে যায় । বিছানায় আধ শোয়া হয়ে থাকে ।

একটু পরে তপুর মা’র গলা । “তপু! তপু ! তোমার ফোন আসছে লেন-ফোনে ।”

তপু অবাক হয়ে যেয়ে ল্যান ফোন কানে লাগায় । পেছনে বাবা মা দাড়িয়ে আছে । তপু কি যেন কি কথা বলে ফোন রাখে ! রাখার একটু খানিক পর পর আরো কয়েকটা ফোন আসে । তপু আগের মতই কিছুক্ষন “হু হা, কোন ব্যাপার’ই না । পৌঁছে যাবে ।” এইসব কথা-বার্তা বলে বলে খুব ভাব নিয়ে ল্যান ফোন রাখে ।

তপুর বাবা তপুর দিকে অবাক হয়ে তাকায় ? চেহারায় আর হাত দিয়ে এমন ভংগি করে ছেলের দিকে তাকিয়ে । যার মানে , “কি ব্যাপার ঘটনা কি ?”

“তিন তলার আশা, চার এর রাকিব-রাতুল, দুই তলার আন্টি, আর সায়মাও তাদের বাসার সবার জন্য ঈদ কার্ডের অর্ডার দিল” বলে তপু খুব প্রফেশনাল ব্যবসায়ী হয়ে গেছে এখন সে , এমন ভংগি করে, ভাব বজায় রেখে, নিজের ঘরে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে ।

ঘরের ওইপাশ থেকে তপুর গলা শুনা যায়, “কেউ যেন আমাকে ডিস্টার্ব না করে! ঈদ কার্ড ডিজাইন করা অনেক কষ্ট আছে ! আর আমার প্রিয় খাবার যেন ঠিক সময় মত আমার ঘরে হাজির থাকে! “

( শেষ )

আয়নার আয় ! না ?

আয়না ! এই আয়না এক কাপ চা দিয়ে যা। কিরে কোথায় গেলি?

বেডরুমে বেড এ শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে কাজের মেয়েকে ডাকছেন মিসেস জাহেদ। আজকে অফিস থেকে ফিরতে তার স্বামি ভিকি জাহেদ এর অন্যান্য দিন থেকে একটু বেশিই দেরি হচ্ছে। ফোন করে ভিকি তাকে বলে দিয়েছে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। তবুও স্বামির ফেরার জন্যে অপেক্ষা করছে সে।

অনেক্ষন ডাকাডাকি করার পরও আয়নার কোন জবাব নেই দেখে মিসেস জাহেদ নিজেই উঠলেন আয়নার শোয়ার ঘর রান্না ঘরের উদ্দেশ্যে।

বেডরুম থেকে বের হয়ে মিসেস জাহেদ ড্রয়িংরুমের বাতি জালালেন। শুন্য নিরব ঘর।
করিডরের বাতি, ড্রয়িং রুমের বাতি তিনি জালিয়েই রেখে ছিলেন। এখন সব নেভানো কেন তিনি বুঝতে পারছেন না। প্রথমে ডর‍্যিং রুমের এবং পরে করিডরের বাতি আস্তে আস্তে জালাতে জালাতে তিনি ধীরে ধীরে রান্না ঘরের দিকে এগুতে থাকলেন তিনি। রান্না ঘরের দিকে এসে দেখলেন এখানেও বাতি নেভানো। দুইবার আয়না ! আয়না !  করে ডাক দিয়েও কোন জবাব না পেয়ে বাতি জালালেন তিনি।

মিসেস জাহেদ হা করে তাকিয়ে রইলেন। আয়না রান্না ঘরের কোনায় কুজো হয়ে বসে হাতে একটি আয়না ধরে আছে। বাতি জালানোর সাথে সাথে তার দিকে তাকিয়ে আয়না বলে, মিশটি শেষ!

আয়নাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কাঁদছিল। অপ্রস্তুত মিসেস জাহেদ এর ভ্রম আয়নার কথায় ভাংগে।

– মিশটি শেষ মানে? চিনি শেষ? যা নিচের দোকান থেকে এক কেজি চিনি আয়!
– আচ্ছা। বলে আয়না তার হাতে ধরা আয়না নিয়েই যেতে নেয় নিচে।
– এটা নিয়ে যাচ্ছিস কেন? রেখে যা !
– জী আপা ।

আয়না দোকানে যাওয়ার পর মিসেস জাহেদ আয়নার আয়না ধরে দেখতে থাকেন অবাক হয়ে। অন্য সব আয়নার মতই দেখতে এই আয়না। শুধু মাজখানে লম্বা এক ফাটলের দাগ। কিন্তু আয়নায় তার চেহারা মোটেও বোঝা যাচ্ছে না। পুরো ঘোলা। হঠাত ফাটা যায়গাটার কোনায় চকচক করে উঠে। ফাটা জায়গায় আংগুল দিয়েই আও করে উঠলেন তিনি। আংগুল দিয়ে রক্ত ঝরছে তার। ফাটা যায়গায় তার আংগুল থেকে পরা রক্ত খানিকটা লেগে আছে এখনো। রাগে রান্না ঘরের জানালা দিয়ে আয়নাটা ছুড়ে মারলেন তিনি।

মিসেস জাহেদ তার কাটা আংগুলে বেন্ড এইড লাগাচ্ছেন। আয়না চিনির প্যাকেট হাতে তার সামনে আসে। আয়না কে দেখে মিসেস জাহেদ বলতে নেন, শোন তোর ভাংগা আয়না….

বলতে বলতেই আয়না তার আরেক হাতে থাকা সেই আয়না মিসেস জাহেদের দিকে ধরে, আর শিতল ভাবে বলে, নিচে পরে গেছিল মনে হয়। নিয়া আসছি।

হা করে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকেন মিসেস জাহেদ। আয়না চিনির প্যাকেট আর তার হাতে থাকা আয়না নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়।

মিসেস জাহেদ বেড এ আধো শোয়া হয়ে চা খাচ্ছেন আর টিভি দেখছেন।

– আয়না ! আয়না ! ডয়িং রুমের বাতিটা নিভালি কেন ! জালিয়ে দে! এই আয়না !

মিসেস জাহেদ বিরক্ত হয়ে উঠে বসেন। ড্রয়িং
রুম পার করে তিনি রান্না ঘরের দিকে যান। রান্না ঘরের কাছাকাছি এসে সে ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ পান। মনে হচ্ছে আয়নাই কার সাথে যেন কথা বলছে, না না! তুমি আমাকে নাও। যত রক্ত লাগে নাও।
– কিরে আয়না ! কার সাথে কথা বলছিস? বলে মিসেস জাহেদ রান্না ঘরের বাতি জালিয়ে যা দেখলেন তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
আয়নার হাত থেকে ঝরঝর করে রক্ত পরছে। আর আয়না কাঁদছে। 

আয়না ঠিক আগের মত বাতি জালানোর সাথে সাথে মিসেস জাহেদের দিকে তাকিয়ে বলে, ও আরো রক্ত চায়। কিন্তু আমার না !

মিসেস জাহেদের ভ্রম ঠিক আগের মতই আয়নার কথায় ভাংগে।

– এই জন্যেই এই অলুক্ষনে আয়না ফেলে দিয়েছিলাম আমি। দে দে এক্ষুনি দে এটা আমার কাছে ।

বলে আয়নার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আবার জানালা দিয়ে ফেলে দেয় ঠিক আগের মতই। পেছন থেকে আয়না না না বলে চিৎকার করতে থাকে।

রাগান্নিত ভাবে হাটতে হাটতে মিসেস জাহেদ তার বেডরুমে যান। যেয়ে টিভি ছেড়ে আবার আগের মত শুয়ে দেখতে থাকেন।

টিভি তে নিউজ হচ্ছে। এই মাত্র খবর পাওয়া গেছে শাহবাগে হঠাত বোমা বিস্ফোরনে গুরুতর আহত তিন এবং নিহত পাচ।

মিসেস জাহেদের স্বামি ভিকি জাহদের অফিস শাহবাগেই। সে তারাতারি মোবাইল হাতে নিয়ে স্বামির নাম্বারে ফোন করতে থাকেন। ফোন যাচ্ছেনা। বার বার ব্যাস্ত বলছে।

বৃশটি শুরু হয়েছে আবার। হঠাত ভীষণ জোরে বিদ্যুত চমকে উঠে। সাথে সাথে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ঠিক আয়নার আয়নার মত মাজখানে ফেটে যায়। মিসেস জাহেদ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ফাটা জায়গা থেকে ঝরঝর করে রক্ত ঝরতে থাকে। আবার জোরে বিদ্যুত চমকায়। আর সাথে সাথেই বাতি নিভে যায়। মিসেস জাহেদের মৃত্যু ভয়ের ভয়ার্ত চিৎকারে পুরো বাড়ি কেপে উঠে।

মোসাদ্দেক চা দোকানদার পান চিবুতে চিবুতে চা বানাচ্ছে। চা’য়ের কাপ দুটো সে কাস্টমারদের দিয়ে দাত খিলি দিয়ে পান খাওয়া দাত খোচাতে খোচাতে সেই আয়নার আয়না বের করে মুখের সামনে ধরে দাত খোচায় আর গান গায়, আয়নাতে তুমি অই মুখ দেখবা যখন…

(শেষ)